মৃত্যু সংবাদে মুমিনের ভাবনা

   


মৃত্যু সংবাদ পাওয়া মাত্রই মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত হয় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, অর্থাৎ, ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই আমরা ফিরে যাব’ কারও মুখে  আয়াত শোনা মাত্রই আমাদের বিবেক জানান দেয়কেউ একজন মারা গেছেন অতঃপর আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য আফসোস করিতার কর্মের হিসাব মিলাইব্যবসার গতিবেগ ভাবিসম্পদ  অট্টালিকার কথা চিন্তা করি এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই কথা হলো আয়াতের মূলমন্ত্র কীএটা অন্যের মৃত্যু সংবাদ দেয় নাকি নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কথাটিতে দুটো বাক্য আছেপ্রথমত ‘ইন্না লিল্লাহি’, অর্থ আমরা তো আল্লাহরই দ্বিতীয়ত ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’, অর্থ ‘আর নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’ দুটো বাক্যই গভীর মর্ম  ব্যঞ্জনার ধারকযার উপলব্ধি মুমিনের বুকে আনে প্রশান্তি  নির্ভরতা আর তার হৃদয়ে জাগিয়ে দেয় এক পবিত্র প্রত্যাশা আয়াতাংশদ্বয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়আমরা আল্লাহর সৃষ্টিমাবুদের নিকট থেকে আমরা  দুনিয়ায় আগমন করেছি আবার মাবুদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবেআমরা তো আল্লাহর’ কথাটিতে আছে এক অপূর্ব সমর্পণ এবং অদ্ভুত অন্তরঙ্গতা আরবি ভাষা হিসেবেও বাক্যটির ভাব  ব্যঞ্জনা এমনই আরবি ভাষাবিদ মনীষীগণ  বাক্যের তরজমা করেছেন এভাবে  আমরা তো আল্লাহর অর্থাৎ তাঁর মাখলুক  সৃষ্টিমামলুক  দাস পৃথিবীতে মালিকানা বলে একটা কথা আছে বাড়ি-গাড়ি জমিজমাকলকারখানাকোম্পানিব্যাংকবীমাসম্পদহ আরও কত কিছুরই মালিকানা রয়েছে এই পার্থিব মালিকানার রয়েছে নানা সূত্র যেমনÑ ক্রয়-বিক্রয়হেবাদানউইলমিরাস ইত্যাদি এই যে মালিকানার নানা সূত্রএগুলো তো সর্বজনস্বীকৃত আর এই স্বীকৃতির ওপরই চলছে গোটা পৃথিবীর সব কাজ-কারবার অথচ লক্ষণীয় বিষয় হলোএসব সূত্রের কোনোটাকেই বলা যায় নাশূন্য থেকে সৃষ্টি শুধু আল্লাহর সৃষ্টিই হলো শুরু থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন কোনো কিছু ইচ্ছা করেনতখন তিনি বলেন, ‘হও’ আর সঙ্গে সঙ্গেই তা হয়ে যায় আর ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’, এই কথাটিতে আছে আখিরাতের প্রতি মুমিনদের ঈমানের ঘোষণা পৃথিবীর নানা অবস্থা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেএই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী এখানের সুখও ক্ষণস্থায়ীদুঃখও ক্ষণস্থায়ী বিপদে আক্রান্ত হলে বুঝে আসেপৃথিবীর সুখ কত অসারপাওয়ার প্রত্যাশা  হারানোর বেদনার মাঝে বাস্তব সুখ কত ক্ষণিকেরস্বজন-প্রিয়জনের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়জীবন কত ক্ষণস্থায়ীকত দ্রুত অপসৃয়মাণ এই তো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে এবং ‘সময়’ আসছে হজরত ওমর (রা.)-এর বিখ্যাত বাণীÑ ‘প্রতিদিন ঘোষণা হয় অমুক মারা গেছেঅমুকের ইন্তেকাল হয়েছে একটি দিন তো অবধারিতযেদিন বলা হবে ওমরের মৃত্যু হয়েছে’ বর্তমানে বৈশিক মহামারি ‘কোভিড -১৯, (করোনা)’ সকাল-সন্ধ্যা আমাদের সেই ক্ষণস্থায়ী জীবনচিরসত্য মৃত্যু  চিরস্থায়ী পরকালীন জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়

 

 

 

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা মৃত্যু সম্পর্কে চমৎকার উপস্থাপন পেশ করেন, ‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে আর অবশ্যই কেয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে- সফলতা পাবে আর দুনিয়ার জীবন শুধুই ধোঁকার সামগ্রী’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেনমৃত্যু তোমাদের পাকড়াও করবেই’ (সুরা নিসা : ৭৮)

 

 সুরা জুমুয়ার  নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যে মৃত্যু থেকে পালাতে চাওসেই মৃত্যুর সঙ্গে অবশ্যই তোমাদের সাক্ষাৎ হবে তারপর তোমাদের সেই মহান আল্লাহর কাছে ফেরত পাঠানো হবেযিনি প্রকাশ্য  অপ্রকাশ্য সব বিষয় জানেন এবং তিনি তোমাদের এবং তোমাদের আমল  কাজকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন’ সুরা মুলকে বর্ণিত হয়েছে, ‘যিনি জন্ম  মৃত্যু সৃষ্টি করেছেনযাতে করে তিনি তোমাদের যাচাই করে নিতে পারেন যেকর্মক্ষেত্রে কে তোমাদের মধ্যে উত্তম’ আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা (মানুষেরমৃত্যু সময় তার প্রাণায়ু বের করে নেনআর যারা ঘুমের সময় মরেনি তিনি তাদেরও রুহ বের করেন অতঃপর যার ওপর তিনি মৃত্যু অবধারিত করেন তার প্রাণবায়ু তিনি (ছেড়ে না দিয়ে রেখে দেনএবং বাকিদের (রুহএকটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছেড়ে দেনএর (ব্যবস্থাপনারমধ্যে এমন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে’ মুমিন ব্যক্তি কারও মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণে আনেননিজের আমলের হিসাব করেনজাহান্নামের ভয়ে কাবু হয়ে যান

 

মৃত্যু সম্পর্কে হাদিসে এসেছেরাসুলুল্লাহ (সা.) বলছেন, ‘মৃতের সঙ্গে তিনটি জিনিস কবর পর্যন্ত যায় এর মধ্যে দুটি ফিরে আসে এবং একটি থেকে যায় যে তিনটি কবর পর্যন্ত যায় তা হচ্ছেমৃতের পরিবার-পরিজন  আত্মীয়স্বজনমাল-সম্পদ  আমল কিন্তু পরিবার-পরিজন  মাল-সম্পদ ফিরে আসে এবং আমল কবরে থেকে যায়’ (বুখারি) এদিকে কীভাবে ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু লাভ করা যায় সে সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলা হয়েছেযারাই মহান আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা গবেষণা করেতাদের সঙ্গে আল্লাহর নিগূঢ় সম্পর্ক তৈরি হয় এবং আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করে ফলে তাদের জন্য ঈমানি মৃত্যু লাভে সহায়ক হয় পৃথিবীর এক চিরন্তন সত্য ‘মৃত্যু  মৃত্যু নামক শব্দটি কারও জন্য প্রচণ্ড ভয়ানক আবার কারও জন্য সফলতার মানদণ্ড দুনিয়ার জীবন থেকে আখেরাতের চিরস্থায়ী ঠিকানায় যাওয়ার অন্যতম মাধ্যমও এটি মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে সতর্ক করতে আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেনÑ ‘তোমরা দুনিয়ার জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছ অথচ পরকালীন জীবনই উত্তম  চিরস্থায়ী’ (সুরা : ১৬-১৭)

 

 সর্বসাধারণ ‘ইন্না লিল্লাহ’ দ্বারা অন্যের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে থাকে আর মুমিনগণ ‘ইন্না লিল্লাহ’ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণকারী ব্যক্তি কখনও আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় না মৃত্যুর কথা স্মরণকারী ব্যক্তির গম্ভীর  গুরুত্বপূর্ণ জীবনে এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হতে পারে না রাসুলের জীবনে একটি মিনিটও অযথা ব্যয় হয়নি যথাযথ পরিকল্পনা  সঠিক পদ্ধতি ছাড়া কেউ উঁচু স্তরে পৌঁছাতে পারে না তাই প্রত্যেক মুসলমানকে মৃত্যুর কথা স্মরণপূর্বক সময়ের মূল্যায়ন করতে হবেযথাযথভাবে সময়কে কাজে লাগাতে হবে  মৃত্যুর স্মরণ কোনো দুঃখপূর্ণ বা নেতিবাচক বিষয় নয় বরং রাসুল (সা.) সুন্নতের অনুসরণ মৃত্যুর স্মরণ সর্বদা নিজের কর্মকাণ্ডের হিসাব গ্রহণগুনাহ থেকে তাওবা করাআল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে আমাদের পার্থিব জীবন হোক বরকতময় এবং পরকালীন জীবন হোক চিরপ্রশান্তির আল্লাহর কাছে এই দোয়া  প্রার্থনা

মুমিনকে সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে এবং বেশি বেশি তওবা করে আল্লাহ বলেন,’ ’মুমিনগণতোমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তওবা কর-আন্তরিক তওবা আশা করা যায়তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতেযার তলদেশে নদী প্রবাহিত সেদিন আল্লাহ নবী এবং তাঁর বিশ্বাসী সহচরদেরকে অপদস্থ করবেন না তাদের নূর তাদের সামনে  ডানদিকে ছুটোছুটি করবে তারা বলবেঃ হে আমাদের পালনকর্তাআমাদের নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন নিশ্চয় আপনি সবকিছুর উপর সর্ব শক্তিমান’’ সুরা তাহরীম - ৬৬: অন্যত্র আল্লাহ বলেন,’ নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাওবাকারীকে ভালবাসেন এবং তাদেরকেও ভালবাসেন যারা পবিত্র থাকে সূরা বাকারা আয়াত ২২২ রাসূল (.) বলেনসকল আদম সন্তানই গুনাহগার তবে তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো তাওবাকারীরা তাওবার সুফল বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল (.) বলেন , তাওবা কারী হলো বেগুনাগ তথা নিষ্পাপ ব্যক্তির মত তাই মুমিনদিগকে সর্বদা তাওবা ইস্তেগফারের মধ্যে ডুবে থাকা উচত

Comments

Popular posts from this blog

Profile Information of YASIN ARAFAT TOHA, Advocate & Columnist

মুমিন জীবনে অনুসরণীয় চরিত্র